সবরিমালা মন্দিরে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশের অধিকার সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট এক অত্যন্ত কঠোর ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো প্রথা বা বিশ্বাস যদি মৌলিক অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হয়, তবে ধর্মের দোহাই দিয়ে তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। শুনানির এক পর্যায়ে বিচারপতির বেঞ্চ মন্তব্য করেন, “যদি কেউ দাবি করেন যে নরমাংস ভক্ষণ তাঁর ধর্মের অংশ, তবে আদালত সেই ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করবে না।” আদালতের এই মন্তব্য মূলত এটিই ইঙ্গিত করে যে, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার কখনো নিরঙ্কুশ নয় এবং জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও স্বাস্থ্যের স্বার্থে রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগ যেকোনো সময় এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
সবরিমালা মন্দিরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার যে দীর্ঘকালীন প্রথা রয়েছে, তার আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা পিটিশনের শুনানিতে এই বিতর্কটি ওঠে। মন্দির কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, মন্দিরের প্রধান উপাস্য দেবতা আয়াপ্পা একজন ‘নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী’, তাই সেখানে নির্দিষ্ট বয়সের নারীদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এটি তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা যুক্তি দিয়ে জানায় যে, সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হলেও তা সামাজিক সংস্কার ও সাম্যের ঊর্ধ্বে নয়। আদালত মনে করে, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কোনোভাবেই ধর্মের অপরিহার্য অংশ হতে পারে পারে না।
শুনানি চলাকালীন বিচারপতিরা আরও উল্লেখ করেন যে, ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং সাংবিধানিক নৈতিকতার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে সর্বদা সাংবিধানিক নৈতিকতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। আদালত যদি দেখে কোনো ধর্মীয় আচরণ বা প্রথা ব্যক্তির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে বা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে, তবে সেখানে হস্তক্ষেপ করা আদালতের দায়িত্ব। বিশেষ করে অস্পৃশ্যতা বা লিঙ্গ বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো যখন ধর্মের মোড়কে উপস্থাপন করা হয়, তখন বিচার বিভাগকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। এই ঐতিহাসিক শুনানিতে আদালত এটিও পরিষ্কার করতে চেয়েছে যে, ধর্মের নামে অমানবিক বা বৈষম্যমূলক আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
সবরিমালা মামলার এই শুনানি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রথা ও ঐতিহ্য রক্ষার দাবি, অন্যদিকে নারীদের সমানাধিকার ও সাংবিধানিক ন্যায়ের প্রশ্ন—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আদালতের এই কড়া অবস্থান ভবিষ্যতে অন্যান্য ধর্মীয় বিতর্কিত প্রথার ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কুসংস্কার বা বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখার দিন যে শেষ হয়ে আসছে, আদালতের এই তীক্ষ্ণ মন্তব্য তারই একটি শক্তিশালী বার্তা। মামলাটির চূড়ান্ত রায়ের দিকে এখন পুরো দেশ তাকিয়ে আছে, যা ভারতের বিচারব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারে।
