জীবনে স্বাচ্ছল্য ও সম্মান অর্জনের জন্য প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা, গবেষণার মানসিকতা এবং কর্মজীবনের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি। আর সেই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে গড়ে তোলার মানসিকতা। সম্প্রতি এক বিশেষ আলোচনায় এমনই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরলেন জেআইএস গ্রুপের ডেপুটি ডিরেক্টর বিদ্যুৎ মজুমদার।
তিনি বলেন, দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ উচ্চশিক্ষার জগতে প্রবেশ করতে চলেছে, আবার কেউ ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যস্ত। প্রায় সকল শিক্ষার্থীরই লক্ষ্য থাকে আরও জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে একটি সম্মানজনক ও স্বচ্ছল জীবন গড়ে তোলা। সেই কারণেই উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আজকের দিনে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।
বিদ্যুৎ মজুমদার উল্লেখ করেন যে এবারের শিক্ষাবর্ষটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০-এর কাঠামোর ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো নতুন শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা লাভ করছে। ৫+৩+৩+৪ কাঠামো অনুসারে গড়ে ওঠা এই শিক্ষানীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল শিক্ষণ পদ্ধতি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনলাইন ও ডিজিটাল শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই শিক্ষাব্যবস্থা তাদের আরও বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী করে তুলতে সক্ষম হবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, নতুন শিক্ষানীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার ধারণা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিজস্ব আগ্রহ, দক্ষতা, শেখার গতি এবং সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠক্রম পরিচালনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে ‘সবার জন্য এক পদ্ধতি’ শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শক্তির জায়গাগুলিকে আরও কার্যকরভাবে বিকশিত করার সুযোগ পাবে।
জাতীয় শিক্ষানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষাব্যবস্থায় নমনীয়তা। বিদ্যুৎ মজুমদারের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তে এই নীতি বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে থাকা কৃত্রিম বিভাজন দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য কিংবা অন্যান্য শাখার মধ্যে সীমারেখা অনেকটাই নমনীয় হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী বহুশাস্ত্রীয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি মাল্টিপল এন্ট্রি এন্ড এক্সিট সিস্টেমের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থার ফলে কোনো শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে পড়াশোনায় সাময়িক বিরতি নিলেও তার শিক্ষাজীবন পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এক বছর সম্পূর্ণ করলে সার্টিফিকেট, দুই বছর পরে ডিপ্লোমা এবং তিন বা চার বছর শেষে স্নাতক বা সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করে তিনি বলেন, নারী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উচ্চশিক্ষা সকলের নাগালের মধ্যে এনে একটি দক্ষ ও মানবসম্পদসমৃদ্ধ জাতি গঠনের লক্ষ্যে এই নীতি কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
আলোচনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ মজুমদার বিশেষ বার্তা দেন। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রকৃত আগ্রহ ও সক্ষমতার চেয়ে সামাজিক প্রচার, পারিপার্শ্বিক চাপ কিংবা অন্যদের অনুসরণ করার প্রবণতায় বেশি প্রভাবিত হন। ফলে বিষয় নির্বাচন বা কলেজ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের মনের ইচ্ছা, স্বপ্ন এবং দীর্ঘদিন ধরে লালিত আগ্রহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং কোনো সিদ্ধান্তই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সবাই ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারি পড়ছে বলে সেই পথই একমাত্র সাফল্যের পথ নয়। আবার অন্যরা সেই বিষয়ে পড়ছে বলে নিজেকেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে- এই ধারণাও সমানভাবে ভুল। বর্তমান সময়ে বায়োটেকনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, জেনেটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, ইলেকট্রনিক্স, টেলিকমিউনিকেশন, মেকাট্রনিক্স এবং ডেটা সায়েন্সের মতো বহু ক্ষেত্র দ্রুত বিকশিত হচ্ছে এবং সেখানে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একইভাবে আইনের ক্ষেত্রেও বহুমুখী সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে শুধুমাত্র প্রচলিত আইনচর্চা নয়, কর্পোরেট আইন, সাইবার আইন, ক্রিমিনাল আইন, স্টার্ট-আপ আইনসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কোনো শাখার শিক্ষার্থীরাই এই ক্ষেত্রগুলিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
কলা ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে বিস্তৃত সম্ভাবনা। কর্পোরেট সাইকোলজি, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল কমিউনিকেশন, স্টোরিটেলিং এবং সৃজনশীল মিডিয়ার মতো ক্ষেত্রে বর্তমানে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে দক্ষ কনটেন্ট নির্মাতাদের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কলেজ নির্বাচন প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ মজুমদার বলেন, শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে নয়, বরং তার পরিকাঠামো, গবেষণার পরিবেশ, ল্যাবরেটরি, ওয়ার্কশপ, লাইব্রেরি, এনএসএস, বিভিন্ন ক্লাব কার্যক্রম, ভাষা শিক্ষার সুযোগ, প্লেসমেন্ট সহায়তা এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। পাশাপাশি NAAC স্বীকৃতি ও NIRF র্যাঙ্কিংয়ের মতো বিষয়গুলিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কলেজজীবনের তিন বা চার বছর একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি নির্মাণের সময়। তাই আবেগ নয়, সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আলোচনার শেষে বিদ্যুৎ মজুমদার বলেন, “ডিগ্রি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ডিগ্রির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল উপযুক্ত দিশা। সঠিক বিষয় নির্বাচন, দক্ষতা অর্জন, প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করার সাহসই ভবিষ্যতের সাফল্যের আসল চাবিকাঠি।”
