বিশ্বজুড়ে চিন্ময় মিশন ৭৫ বছরের গৌরবময় পথচলা উদ্যাপনের মাঝে ত্রিপুরার মানুষের উদ্দেশ্যে আগরতলায় উৎসর্গ করতে চলেছে “মা সৌন্দর্য চিন্ময়ী মন্দির”। সেবা, শিক্ষা এবং সমাজকল্যাণের ভিত্তিতে নির্মিত এই মন্দিরকে একটি সর্বাঙ্গীন আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আদি শঙ্করাচার্যের সার্বজনীন দর্শন এবং স্বামী চিন্ময়ানন্দের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে এই মন্দিরকে কেবল উপাসনার স্থান নয়, বরং আধ্যাত্মিক চিন্তন ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি, “সৌন্দর্যলহরী”-র গভীর জ্ঞানকে সমাজের বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়াও এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
চিন্ময় মিশনের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ষ জুড়ে পালিত “চিন্ময় অমৃত মহোৎসব”-এর এই উৎসর্গ কর্মসূচীর একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করছে। এই মন্দিরটি স্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের স্মৃতি বহন করে। এই মন্দিরের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জাগরণকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ ও জাতি গঠনের যে লক্ষ্য এবং তার প্রতি মিশনের দৃঢ় অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
“সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক সময়ের জন্য সর্বাধিক সুখ” পূজ্য গুরুদেব স্বামী চিন্ময়ানন্দের এই মহৎ আদর্শকে সামনে রেখে, মিশনটি ত্রিপুরায় বিশেষভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি বিনামূল্যের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিদ্যালয় মূলত অনাথ, একক অভিভাবকের সন্তান, ভূমিহীন শ্রমিক পরিবারের শিশু এবং মাসিক ১০,০০০ টাকার কম আয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য। গত বছর রথ সপ্তমীর পবিত্র দিনে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১০০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, এবং প্রতি বছর আরও ২৫ জন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মন্দির ও বিদ্যালয় মিলিয়ে এই উদ্যোগটি আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির এক অনন্য সমন্বয়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনআসবে এবং তা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে বলে আশাবাদী চিন্ময় মিশন।
চিন্ময় মিশনের এই মহৎ উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন স্বামী মিত্রানন্দ, যার দূরদর্শী দিকনির্দেশনা এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই প্রচেষ্টায় সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য—চিন্ময় হরি হর স্কুলের অভিভাবকরা পর্যায়ক্রমে মন্দিরের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। ইতিমধ্যেই মিশনের বিভিন্ন শাখা যেমন বালবিহার, যুব কেন্দ্র এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি ত্রিপুরায় সক্রিয় রয়েছে। ভবিষ্যতে রাজ্যের আটটি জেলায় মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রম আরও প্রসার লাভের পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব—আরএসএস প্রধান ডঃ মোহন ভাগবত, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডঃ মানিক সাহা, ত্রিপুরার রাজ্যপাল এন. ইন্দ্রসেনা রেড্ডি এবং মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল জিষ্ণু দেব বর্মা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পূজ্য স্বামী মিত্রানন্দ (আচার্য, চিন্ময় মিশন চেন্নাই ও ত্রিপুরা), পূজ্য স্বামী বিজ্ঞানানন্দ (বিশ্ব হিন্দু পরিষদ), পূজ্য স্বামী বিবিক্তানন্দ (প্রধান, চিন্ময় মিশন কেরল), রাজপরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং অন্যান্য সন্ন্যাসী ও বিশিষ্টজন।
স্বামী মিত্রানন্দ বলেন, “মা সৌন্দর্য চিন্ময়ী মন্দির আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সমাজসেবার এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। চিন্ময় মিশনের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে চিন্ময় অমৃত মহোৎসবের এই উদ্যোগ আমাদের আধ্যাত্মিক বিকাশ, শিক্ষার প্রসার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করে। আমরা এই মন্দিরকে শুধুমাত্র উপাসনার স্থান হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা, চিন্তন ও সমাজসংযোগের এক গতিশীল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যা আগামী প্রজন্মের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মানিক সাহা বলেন, “এই মন্দির ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি আমাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে আসে। চিন্ময় মিশনের এই ধরনের উদ্যোগ, যেখানে আধ্যাত্মিকতা, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ একসূত্রে গাঁথা, তা একটি শক্তিশালী সমাজ গঠন এবং আগামী প্রজন্মকে ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
