শিলিগুড়িতে উদ্বেগজনক চিত্র: প্রতিদিন গড়ে নির্যাতিত তিন মহিলা

শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট এলাকায় প্রতিদিন গড়ে অন্তত তিনজন নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, যা শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটান পুলিশের প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে। সম্প্রতি বিশ্বভারতীর মাস কমিউনিকেশন বিভাগের এক শিক্ষার্থীর আরটিআই (তথ্য জানার অধিকার আইন) আবেদনের প্রেক্ষিতে এই তথ্য প্রকাশ পায়, যা শহরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রিপোর্টে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৯১টি নারী নির্যাতনের অভিযোগ জমা পড়েছে, অর্থাৎ শহরের প্রতিটি থানায় প্রতিদিন গড়ে দুটির বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৯৯১টি অভিযোগের মধ্যে ৭৫৫টিই গার্হস্থ্য হিংসা সংক্রান্ত। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গার্হস্থ্য হিংসার একটি বড় কারণ হিসেবে পরকীয়া উঠে আসছে। এছাড়া পণ সংক্রান্ত নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। সূর্য সেন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা সুতপা সাহা এই বিষয়ে মন্তব্য করেন, “আসলে সময়ের সঙ্গে বাড়িতে নারী অত্যাচারের রূপটা বদলে যাচ্ছে। আগে স্বামীর প্রভুত্ব বিস্তারের জন্য অত্যাচার করত, এখন সেটা অনেকাংশে পরকীয়ার মতো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “এত অভিযোগ যে জমা পড়েছে, এটাও একটা বড় দিক। মহিলারা এখন অত্যাচার সহ্য না করে অভিযোগ করছেন। অর্থাৎ মহিলারা এখন চুপ করে থাকছেন না।”

শিলিগুড়িতে ধর্ষণের অভিযোগ, বিশেষ করে নাবালিকা গর্ভবতী হওয়ার মতো ঘটনা সম্প্রতি সামনে এসেছে। রিপোর্টে দেখা যায়, ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থা মিলিয়ে মোট ২০৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগ ১৩৫টি। ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত হয়েছে মাটিগাড়া থানায় (৩৮টি), এরপর রয়েছে এনজেপি থানা (২৫টি) এবং মহিলা থানা (২১টি)।

অন্যদিকে, যৌন হেনস্থার অভিযোগ (মোট ৭২টি) সবচেয়ে বেশি জমা পড়েছে শিলিগুড়ি থানায় (১৬টি)। এই অভিযোগগুলির প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে মারপিটের ঘটনার মধ্যে যৌন হেনস্থার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বাকি অভিযোগের মধ্যে নাবালিকারাও রয়েছে।

গ্রামীণ এলাকায় এখনও পণ সংক্রান্ত সমস্যা রয়ে গেছে। পণ সংক্রান্ত নির্যাতনের ৭টি অভিযোগের মধ্যে মাটিগাড়া থানায় ৪টি এবং এনজেপি থানায় ৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সুতপা সাহা মনে করেন, “পাড়ায় পাড়ায়, তৃণমূল স্তরে গিয়ে এ সংক্রান্ত ব্যাপারে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানোটা অনেকটা বেশি প্রয়োজন।” মাটিগাড়ার বিডিও বিশ্বজিৎ দাস জানান, “আমরা এ সংক্রান্ত ব্যাপারে অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের সচেতন করছি।”

শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটান পুলিশ জানিয়েছে, ৯৯১টি মামলার মধ্যে ৮৪০টি মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। ১৪৬টি মামলার তদন্ত এখনও চলছে এবং বাকি মামলার বিচার প্রক্রিয়া (ট্রায়াল) চলছে। তারা আরও জানিয়েছে, ৯৯১টি অভিযোগের মধ্যে ১৪২টি এসেছে ইমারজেন্সি রেসপন্স সাপোর্ট সিস্টেম (ERSS) এবং ১০০ নম্বর ডায়ালের মাধ্যমে।

শহর এবং শহর সংলগ্ন এলাকা আধুনিক হয়ে উঠলেও, এখনও পণপ্রথা, গার্হস্থ্য হিংসা এবং ধর্ষণের মতো ঘটনা সমাজের এক অন্ধকার দিককে তুলে ধরছে।