কোচবিহার জেলার সরকারি ও সরকার-পোষিত ২০৯টি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল এবং বেশ কিছু হাই মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিকের বিষয়গুলো পড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। অভিযোগ উঠেছে যে, রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের কাছে বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও এই সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না, যার ফলে পড়ুয়ারা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক স্কুল ও মাদ্রাসা বাধ্য হচ্ছে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের ক্লাস চালাতে। কিছু ক্ষেত্রে জোড়াতালি দিয়ে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের মাধ্যমে পাঠদান চলছে, যা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির জেলা সভাপতি এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের কোচবিহার জেলা আহ্বায়ক মানস ভট্টাচার্য এই সমস্যা স্বীকার করে বলেছেন, “বেশ কিছু উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার ঘাটতি রয়েছে। এখন ক্লাস্টার পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করছি। শীঘ্রই শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। তাতে সমস্যা মিটবে।”
উদাহরণস্বরূপ, শীতলকুচি ব্লকের নগর ডাকালিগঞ্জ হাইস্কুলে ১,৭৫০ জন ছাত্রছাত্রী থাকলেও, উচ্চমাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগে (একাদশে ৩৫ জন, দ্বাদশে ৩০ জন) গণিত, জীবনবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা পড়ানোর একজনও শিক্ষক নেই। কলা বিভাগেও বাংলা ও সংস্কৃত পড়ানোর শিক্ষক নেই। স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্বপন সিংহ হতাশার সুরে বলেন, “বাধ্য হয়ে স্কুলের মাধ্যমিক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিয়ে এবং দুই-একজন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষিকা দিয়ে কোনোভাবে বিজ্ঞান পড়ানোর চেষ্টা করছি।”
একই চিত্র মাথাভাঙ্গার কোদালক্ষেতি হরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ে, যেখানে প্রায় এক হাজার ছাত্রছাত্রী রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক কলা বিভাগে পড়ানোর জন্য একজনও শিক্ষক নেই। প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় সরকার বলেন, “স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা এতই সমস্যায় পড়েছেন যে প্রতিদিন ক্লাস চালাতে খুবই অসুবিধায় পড়তে হয়। এভাবে কতদিন সম্ভব তা বুঝতে পারছি না।”
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মতে, শিক্ষা দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একটি স্কুলে কমপক্ষে ৬ জন, মাধ্যমিক স্কুলে কমপক্ষে ১২ জন এবং উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে কমপক্ষে ১৮ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকার কথা। কিন্তু কোচবিহার জেলায় ২০১৫-১৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হওয়া স্কুলগুলিতে গড়ে মাত্র দুজন করে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। এমনকি ২০২১-২২ সালে উন্নীত হওয়া স্কুলগুলিতেও কার্যত কোনো শিক্ষক নেই।
দিনহাটার নাজিরহাটের শোলমারি নছিমিয়া হাই মাদ্রাসাও ২০১৫-১৬ সালে উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু সেখানেও উচ্চমাধ্যমিকে পড়ানোর একজনও শিক্ষক নেই। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক বিদ্যুৎ সরকার বলেছেন, “উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষক-শিক্ষিকা চেয়ে শিক্ষা দপ্তরের কাছে একাধিকবার আবেদন করেছি। এপর্যন্ত কোনো সহযোগিতা পাইনি। খুবই সমস্যায় রয়েছি।” বাউদিয়ারডাঙ্গা এইচবি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সঞ্জীব আচার্য জানান, তাদের স্কুলেও কলা বিভাগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন এবং বিজ্ঞান বিভাগে গণিত ও পদার্থবিদ্যা পড়ানোর জন্য কোনো শিক্ষক নেই।
এই পরিস্থিতি কোচবিহার জেলার উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এবং দ্রুত পদক্ষেপের দাবি উঠছে।
